আজ প্রকৃতিবিদ, বিবর্তনবাদের জনক চার্লস রবার্ট ডারউইন এর জন্মদিবস। আজ সারা বিশ্বের বিজ্ঞান সচেতন মানুষ "ডারউইন দিবস (Darwin Day)" পালন করছে। আজ থেকে ২০০ শত বৎসর আগে ১৮০৯ সালের এই দিনে ডারউইন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুল পালানো ছেলে ডারউইন পরবর্তীকালে বিবর্তন বাদ নামক এক যুগান্তকারী তত্ত্বের জন্ম দেন। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী এবং উদ্ভিদের জন্ম, বেড়ে ওঠা ও মৃত্যু সম্বন্ধে এমন কিছু কথা বলেন যা প্রচলিত ঈশ্বর আশ্রয়ী ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। ডারউইন এক নতুন কথা শোনালেন। তিনি প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাসের মূলে কঠোর আঘাত হানলেন। তিনি আমাদেরকে জানালেন যে কোন অলৌকিক ফু দিয়ে এই পৃথিবী ও বিশ্বব্রহ্মান্ডসহ মানবপ্রজাতির সৃষ্টি হয়নি। কোন রকম 'কুন' বা 'টুনটুন' বলার মাধ্যমে প্রাণীজগত মাটি ফুড়ে পৃথিবীর মধ্যে উপস্থিত হয়নি। আকাশ থেকেও ধপাস ধপাস করে ডাইনোসর, হাতী, তিমি, বাঘ ইত্যাদি প্রাণী মাটিতে পরেনি। তিনি বলেছেন যে বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুযায়ী পরিবেশের প্রভাব অনুযায়ী, অনেক সময় নিয়ে, ধীর গতিতে প্রাণীসমুহের বিকাশ হয়েছে। তারা বিলুপ্ত হয়েও গেছে সেরকম কোন দীর্ঘমেয়াদী কারণে।
ডারউইন সম্পর্কে কিছু তথ্য:
জন্মস্থান: ইংল্যান্ডের মফস্বর শহর 'শ্রুসবারি'।
তারিখ: ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৮০৯ সাল
পিতা: রবার্ট ডারউইন
পিতামহ: এরেসমাস ডারউইন
পড়াশোনা: শ্রুসবারির গ্রামার স্কুল
ডাক্তারি পড়তে যান: এডিনবরা
পাদ্রি হওয়ার জন্য ভর্তি হন: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৮২৮
পাদ্রি হিসেবে স্নাতক ডিগ্রী পান: ১৮৩১ সালে
বিগল জাহাজ যাত্রা শুরু করে: ১৬ ডিসেম্বর ১৮৩১ সালে,
জাহার ছাড়ার স্থান: প্লিমাউথ বন্দর
ব্রাজিল পৌঁছে: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৮৩২ সালে
পেরুর রাজধানী লিমাতে পৌঁছে: ১৯ জুলাই ১৮৩৫ সালে
গ্যালাপাগাস দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছে: ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৫ সালে
তাহিতি দ্বীপে পৌছে: ১৫ নভেম্বর, ১৮৩৫ সালে
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বন্দরে পৌছে: ১২ জানুয়ারি, ১৮৩৬ সালে
মরিশাস দ্বীপে পৌছে: ২৯ এপ্রিল, ১৮৩৬ সালে
সেন্ট হেলেনা দ্বীপে: ৮ জুলাই
ইংল্যান্ডের কর্ণওয়ালের ফ্যালমাউথ বন্দরে ফেরেন: ০২ অক্টোবর, ১৮৩৬ সালে
"প্রজাতির উৎপত্তি (Origin of Species)" প্রকাশিত হয়: ১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর
ডারউইন মৃত্যুবরণ করেন: ১৯ এপ্রিল, ১৮৮২ সালে।
* ডারউইনের ভ্রমণসঙ্গীদের সম্পর্কে জানুন এই পেজ থেকে।
ডারউইন সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য ও তাঁর রচনাগুলো একেবারে বিনেপয়সায় ডাউনলোড করুন গুটেনবার্গ সাইট থেকে।
'ডারউইন দিবস' বাংলাদেশীরা সফলভাবে পালন করতে শিখুক। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি স্কুল-কলেজে এই দিবস সম্পর্কে আলোচনা হোক, শিক্ষিত মানুষরা সচেতন হোক, বাংলাদেশে ডারউইন পাঠকের সংখ্যা আরও বাড়ুক আজকের দিনে এটাই প্রত্যাশা করি।
Two Essays written in 1842 and 1844 (English)
or the Preservation of Favoured Races in the Struggle for Life. (2nd edition) (English)
আপনাকে ডারউইন দিবস ২০০৯ (Darwin Day 2009) এর শুভেচ্ছা
আজ ডারউইন দিবস
ডারউইন দিবস পালন করুন
এ বৎসরের ফেব্রুয়ারি মাসে অর্থাৎ এই মাসের ১২ তারিখে পালিত হতে যাচ্ছে 'ডারউইন দিবস'। ডারউইন দিবস হিসেবে এই বৎসরটি একটি বিশেষ দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০০৯ সালে পালন হচ্ছে ডারউইনের ২০০তম জন্মবার্ষিকী। এছাড়াও ডারউইনের বিখ্যাত "অরিজিন অফ স্পেসিস" বইটির প্রকাশনারও ১৫০তম বৎসরও পালিত হচ্ছে এই বৎসর।
ডারউইন দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ইন্টারনেটেও এই উৎসবের আয়োজন কম নয়। বিজ্ঞানসচেতন, মুক্তচিন্তার অধিকারী মানুষেরা ডারউইন দিবসটিকে নানাভাবে স্মরণ করতে যাচ্ছে। বাংলাভাষী মুক্তমনের মানুষদের ওয়েবসাইট মুক্তমনাতেও ডারউইনকে স্মরণ করার জন্য পুরস্কারসহ প্রবন্ধরচনার আয়োজন করা হয়েছে। উৎসাহী বিজ্ঞানচেতনায় বিশ্বাসীরা মুক্তমনা সাইট থেকে এ বিষয়ক ঘোষণাটি একবার দেখে নিতে পারেন।
বাংলাভাষী মানুষদের মধ্যে মুক্তচিন্তার বিকাশ তেমনভাবে হয়নাই বলে বাংলাভাষার বিভিন্ন ব্লগ বা সাইটগুলোতে ডারউইন দিবস নিয়ে কোনরকম ভাবনাচিন্তার কোনরকম চিহ্ন এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। মুক্তমনাই একমাত্র ব্যতিক্রম।
ইংরেজি ভাষায় ডারউইন দিবসের বিভিন্ন রকম আয়োজনের খবরাখবর জানতে আগ্রহী পাঠকেরা নিচের লিংকগুলি ভ্রমণ করে দেখতে পারেন।
এছাড়া ডারউইনের ভ্রমণকাহিনীটি ধারাবাহিকভাবে পাঠ করতে পারেন the beagle project থেকে।
চার্লস ডারউইনের উপর ছোট্ট পাচ মিনিটের একটি ভিডিও দেখুন
===
===
প্রথম পাখি আর্কিওপটেরিক্স
নিচের ছবিদুটো ফসিল দেখে কল্পনা করে শিল্পীর আকা।
সমকাল পত্রিকার কালস্রোত বিভাগে আর্কিওপটেরিক্স Archeopteryx (Archaeopteryx) সম্বন্ধে একটি মনোজ্ঞ আলোচনা দেখলাম। লিখেছেন নোমান মোত্তাকী।
আজকে আমরা যে প্রাণীটিকে পাখি বলে ডাকি, তাদের পূর্বপুরুষ এসেছে ডাইনোসরের একটি প্রজাতি থেকে। জুরাসিক যুগে দুই পাওয়ালা বিশাল আকৃতির পালকযুক্ত ঠোঁটে দাঁতওয়ালা ডাইনোসর থেকে বর্তমানকালের পাখিগুলো বিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানকালের পাখিদের মতো এদের শরীরেও বায়ুথলি ছিল, হৃদপিণ্ড ছিল চার প্রকোষ্টবিশিষ্ট। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে প্রথম পাখির কথা রচনায়।
কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফি স্ক্যান প্রক্রিয়ায় প্রাচীনকালের পাখিদের এসব বৈশিষ্ট্য ঠিকঠাকভাবেই বুঝতে পারা যায়। আর এসব বৈশিষ্ট্য আজও অবশিষ্ট রয়েছে বর্তমানের পাখিদের মাঝে।সমকাল, ৩১ অক্টোবর, ২০০৮ এখানে ক্লিক করে বাকীটুকু পড়ুন
মূলত সরীসৃপ ও পাখিতে রূপান্তরিত হওয়া ডাইনোসরদের একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল, যার প্রমাণ মিলেছে আরকিওপটেরিক্সের একটি জীবাশ্ম থেকে। সেগুলো ছিল পালকাবৃত সরীসৃপ, যারা প্রথমে ছিল স্থলচর। পরে ক্রমাগত পাখিতে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ায় আবাস স্থাপন করেছিল পাহাড়ের চূড়ায়। খুঁজে পাওয়া আরকেওপ্টিরিক্সের জীবাশ্মটি আবিষ্কৃত হয়েছিল চার্লস ডারউইনের ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ প্রকাশের মাত্র দুই বছরের মাথায় (১৮৬১)। প্রাণী বিবর্তনের এটি ছিল একটি মুখ্য প্রমাণ, যা জীবাশ্মবিদ এবং একই সঙ্গে পাখিবিদদের আগের সব চিন্তা-ভাবনাকে বিবর্তনের আলোকে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।
অবশ্য ১৯৯০ সাল থেকেই পালকাবৃত অসংখ্য ডাইনোসরের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া যেতে লাগল, যা থেকে ডাইনোসরের পাখি হওয়ার ধারণাটি আরো সুদৃঢ় হলো। এসব ফসিলের অধিকাংশই খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। ক্রিটেসিয়াস যুগে এই অঞ্চলটি ছিল সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোর অন্যতম এবং স্বাভাবিকভাবেই উড়ন্ত ডাইনোসরের আবাসস্থল। পালকাবৃত ডাইনোসরের মধ্যে অন্যতম ছিল ডিলং, মাইক্রোরেপ্টর, প্রটারিচপ্টিরেক্স, সাইনোরনিথসরাস এবং জিনফেনগপ্টিরেক্স। এছাড়া ডাইনোসরসদৃশ পাখি কনফিউসিওসরনিসের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া গেছে! যা অর্ধলাখ বছর আগেও পৃথিবীতে বিচরণশীল ছিল বলে ধারণা করা হয়। তাছাড়া স্থলচর ডাইনোসরের এমন কতগুলো প্রজাতির সন্ধন পাওয়া গেছে, যেগুলো পাখি ছিল না, অথচ তাদের দেহ ছিল ছোট এবং নরম পালকে আবৃত। লাখ লাখ বছর আগে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ডাইনোসরের জীবাশ্ম থেকে চামড়া বা পালক কোনোটারই সন্ধন পাওয়া যায়নি। কেননা, লাখ লাখ বছরের ধারাবাহিকতায় শরীরের এসব অংশের স্থায়িত্ব হয় খুবই কম। তবে পরীক্ষণ দ্বারা চামড়া বা পালকের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। অবশ্য, পাখিতে রূপান্তরিত ডাইনোসর ছাড়াও স্থলচর ডাইনোসরের বেশকিছু ছিল পালকাবৃত সরীসৃপ!
ট্রাইনোসরাস রেক্সের জীবাশ্ম পর্যবেক্ষণে সুষ্ঠভাবে ডাইনোসরের বিবর্তনের ধারাবাহিকতার বর্ণনা দেওয়া যায়। চারটি পা, বিশাল আকৃতির দেহ-কাঠামো এবং অত্যন্ত হিংস্র মাংসাশী স্বভাবের এই প্রজাতিটি ডিম পাড়ার সময় পেটের ভেতর বিশেষ ধরনের ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ একটি হাড় গঠন করত। ডিমের ওপরকার শক্ত আবরণ তৈরিতে এই হাড়ের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল; এবং এ থেকে প্রমাণিত হয়, ট্রাইনোসরাস রেক্স প্রজাতির ডাইনোসর ছিল স্ত্রী প্রজাতির। আর তাদের প্রজনন বৈশিষ্ট্য আধুনিককালের পাখির মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। ট্রাইনোসরাস রেক্স ছিল স্থলচর সরীসৃপ। আর পাখি প্রজাতির ডাইনোসরগুলো তাদের থেকে আচরণগত দিক দিয়ে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এরপরও প্রজনন বৈশিষ্ট্যের আলোকে সহজেই অনুমেয়, একই পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভব ঘটেছিল এই দুটি ভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসরের। তাছাড়া তাদের রক্তনালিগুলো ছিল আধুনিক পাখিকুলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ডাইনোসর সম্পর্কে আমাদের ধারণাগুলোর সাধারণ ভিত্তি হচ্ছে- খুঁজে পাওয়া জীবাশ্মের গঠন, আবাসস্থলের এবং কম্পিউটার সিমুলেশনে খুঁজে পাওয়া জৈবিক বৈশিষ্ট্যগুলো, যার শতভাগই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে আমাদের কল্পনা আর অনুমান দ্বারা। তবে আধুনিক সময়ে বেঁচে থাকা দুটি প্রজাতির (কুমির জাতীয় সরীসৃপ ও পাখি) আচরণগত কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য যে প্রাচীন ডাইনোসরদের মাঝে বিদ্যমান ছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অভিযোজনের স্বার্থেই ডাইনোসরের শরীরে লোম ও পালক সৃষ্টি হয়েছিল। ট্রিয়াসিক যুগেই পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া ডাইনোসরের পরিবেশ ভেদে অভিযোজন ঘটেছিল, যার ফলে তারা পৃথকভাবে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকতে পারে। যেসব ডাইনোসরের অভিযোজন ঘটেছিল অপেক্ষাকৃত শীতল পরিবেশে (যেমন, এন্টার্কটিকা বা অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশের ডাইনোসর), সেগুলোর অভিযোজনের প্রক্রিয়াটি ছিল ভিন্নতর। পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা কম হওয়ায় দেহাভ্যন্তরে সৃষ্ট তাপ যাতে অতিমাত্রায় বের হতে না পারে, সেজন্য তারা শরীর আবৃত করেছিল ঘন পালক দ্বারা।
কল্পনাপ্রসূত প্রণোদনাগুলো ডাইনোসরকে আমাদের কাছে অতিকায় দানব হিসেবে পরিচিত করেছে, যদিও তৃণভোজী ডাইনোসরের স্বভাব ছিল অপেক্ষাকৃত ধীর প্রকৃতির। তীক্ষ্ণ দাঁতযুক্ত এই বিশাল আকৃতির সরীসৃপের সঙ্গে তখন সহাবস্থান করত আকাশে উড়ে বেড়ানো কিছু সরীসৃপ, যাদের দাঁতের স্থানটি দখল করেছিল শক্ত দুটি ঠোঁট (তারাই ছিল আধুনিক পাখির পূর্বপুরুষ এবং পৃথিবীর প্রথম পাখি), যা দিয়ে সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাগুলোর মুখে খাবার তুলে দিত তারা। এসব ডাইনোসরের সামনে দুটি পা অভিযোজনের স্বার্থেই এক পর্যায়ে ডানায় রূপান্তরিত হয়েছিল। আর এদের চোয়াল শক্ত আবরণীতে আবদ্ধ হয়ে ঠোঁটে মিশে যায়।
আরকেওপ্টিরিক্সের জীবাশ্মের আধুনিক বিশেল্গষণ থেকে জানা যায়, এরা সম্পূর্ণভাবে পাখিতে পরিণত হয়েছিল এবং এদের চোয়ালে আধুনিক পাখির মতো ছিল বেশ উন্নত দাঁত। এদের ছিল একটি যুক্ত হাড়ের লেজ আর ডানায় ছিল পাখিদের মতো পালক। আধুনিক পাখির মতোই তাদের মস্তিষ্ক ছিল বেশ উন্নত। এদের প্রখর দৃষ্টিশক্তির কথা উলেল্গখ করতে গেলে এভাবেই বলা যায়- এরা খুব দ্রুত টেলিস্কোপীয় দৃষ্টিশক্তি থেকে মাইক্রোস্কোপীয় সূক্ষ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় দৃষ্টিকে রূপান্তর করতে পারত। আনুমানিক ৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে অন্যান্য প্রজাতির পাশাপাশি উড়ন্ত সরীসৃপের অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে যায়। সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হয় কিছু কিছু সাঁতার কাটতে সক্ষম সরীসৃপও। তবে পৃথিবীতে তখন এমন কিছু সরীসৃপের অস্তিত্ব ছিল, যাদের সঙ্গে ডাইনোসরের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। আকস্মিক বিলুপ্তির খাতায় তারাও নাম লেখাল। তবু কোনো এক কারণে টিকে গিয়েছিল কিছু সরীসৃপ, যাদের বিকট আওয়াজে আবারো কাঙ্ক্ষিত হয়েছিল পৃথিবী। তারা আজও বেঁচে আছে এই পৃথিবীর বুকে- কখনো সরীসৃপ হয়ে, কখনোবা পাখি হয়ে। আমাদের আবির্ভাব তাদের জন্য অশনিসংকেত! যদিও তাদেরই কোনো এক পূর্বপুরুষের ভয়ে আমরা ভীত ছিলাম এবং অস্তিত্বের স্বার্থে উপনিবেশ স্থাপন করেছিলাম বৃক্ষের মগডালে।
ডলফিনের জন্য ভালোবাসা
একসময় বাংলাদেশের খুব কম নদনদীই ছিল যেখানে শুশুক দেখা যেত না। প্রতিকুল পরিবেশ, মানুষের বৈরিতায় আস্তে আস্তে বড় কিছু নদী ছাড়া আর সব জলাশয় থেকেই প্রায় হারিয়ে গেছে ডলফিনের এ প্রজাতি। তার পরও সাম্প্রতিক কিছু জরিপ বলছে, এখনো আশপাশের দেশের তুলনায় আমাদের দেশে ডলফিনের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বাংলাদেশে ডলফিনের অবস্থা নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদন।
ডলফিন নিয়ে আলাদা করে কোনো আগ্রহ রুবাইয়াত মনসুর মুগলির ছিল না। তাঁকে আগ্রহী করে তোলেন ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির প্রকল্প পরিচালক ব্রায়ান স্মিথ। ২০০০ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভদ্রলোক। বেসরকারি পর্যটন সংস্থা দ্য গাইড ট্যুরস লিমিটেডের ভ্রমণতরীতে করে সুন্দরবন গিয়েছিলেন তিনি। সুন্দরবন যাওয়ার পথে নদীতে শুশুকসহ অনেক ডলফিন দেখলেন ব্রায়ান। ওই অঞ্চলের নদীর পানিতে জলজ স্তন্যপায়ী গোত্রের প্রাণী দেখে গাইড ট্যুরসের মুগলিকে গল্প শোনাতে লাগলেন তিনি। সেই প্রথম মুগলি জানলেন, বাংলাদেশের নদনদী ও বঙ্গোপসাগরে নানা জাতের ডলফিন আছে। গভীর সমুদ্রে আরও আছে ডলফিনেরই জাতভাই তিমি। ব্যস, আর যায় কোথায়! এই বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে শুরু করলেন রুবাইয়াত মুগলি। আর তাঁকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করার জন্য ব্রায়ান স্মিথ তো ছিলেনই।
২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির জন্য বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তিমি ও ডলফিন সংরক্ষণ সংস্থা এবং কনভেনশন অন মাইগ্রেটরি স্পিসিজের সমর্থনে মূলত ব্রায়ান স্মিথের আয়োজনে প্রথমবারের মতো শুরু হয় রুবাইয়াতের ডলফিন নিয়ে জরিপের কাজ। জরিপে অংশ নেন ভারত, বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা। জরিপের জন্য তাঁরা ঘুরে বেড়িয়েছেন সুন্দরবনের সব নদী ও খাল। আইইউসিএনের সঙ্গে যৌথভাবে আবার সুন্দরবনের জলপথ ধরে চলে গবেষণা। বাংলাদেশের জলসীমায় থাকা স্তন্যপায়ী প্রাণিবৈচিত্র্যের সন্ধান করা এবং সেগুলো যেন বিলুপ্ত হয়ে না যায় সে লক্ষ্যে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তার অনুসন্ধানই ছিল রুবাইয়াতের মূল লক্ষ্য।
২০০৪ সালে বাংলাদেশের উপকুল ধরে মিয়ানমারের সীমানা থেকে অর্থাৎ নারিকেল জিঞ্জিরার উপকুল থেকে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের শেষ সীমা পর্যন্ত চালানো হয় আরেকটি জরিপ। এই জরিপেও বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কার ১৫ জন বিজ্ঞানী অংশ নেন। তখনই তাঁরা এই অঞ্চলে সামুদ্রিক ডলফিন ও তিমির দেখা পান। সেই সঙ্গে সুন্দরবনের গভীর সমুদ্রের গিরিখাদ বা অতলস্পর্শে ডলফিনের বৈচিত্র্য ও এদের অবাধ বিচরণ দেখেন।
২০০৫ সালে আবার এ জায়গায় জরিপের সময় তাঁরা প্যানট্রপিক্যাল স্পটেড ডলফিন ও স্পিনার ডলফিনের অস্তিত্ব খুঁজে পান।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জরিপ চলতে থাকলেও কোনো আনুষ্ঠানিক ভিত্তি না থাকায় রুবাইয়াত ২০০৬ সালের জুলাই মাসে এসে গঠন করেন বাংলাদেশ সেটেশন ডাইভার্সিটি প্রজেক্ট (বিসিডিপি)। রুবাইয়াতও পুরোদমে প্রধান গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
ছয় বছরের জরিপের ফলাফলে মোটামুটি একটা সংখ্যা বের হয়ে এসেছে। গাইড ট্যুরসের ভ্রমণতরী এমভি অবসর, এমভি ছুটি ও এমভি বনবিবির সারেংরাও এই জরিপে অংশ নেন। তাঁরা দল, একক ও বাচ্চা−এই তিনটি ভাগে জরিপটি পরিচালনা করেন। সেই হিসাবমতো শুশুকের এক হাজার পাঁচটি দল, একক এক হাজার ৯৯৩টি এবং বাচ্চা ২৩৫টি গণনা করা হয়। আর ইরাবতী ডলফিনের ২৮১টি দল, একক ৫৬৬টি এবং বাচ্চা ৩২টি দেখা গেছে। এই জরিপ করা হয়েছে সুন্দরবনের সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ২৬ হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।
সামগ্রিক জরিপে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রায় ছয় হাজার ইরাবতী ডলফিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কিন্তু শুধু অস্তিত্ব থাকলেই হবে না; তাদের অস্তিত্ব যেন বিলুপ্তির দিকে না যায় সেই লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে। তাই বিসিডিপি কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। জনসচেতনতা তৈরি করতে তারা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে নানা ধরনের বইপত্র, যেখানে ডলফিন ও তিমিবিষয়ক নানা তথ্য দেওয়া আছে। আবার সামাজিকভাবে সংঘবদ্ধ করে আলোচনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্থানীয় নেতা এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরাও এই সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছেন। খেলাধুলা ও ছবির মাধ্যমেও প্রাণিবৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেই সঙ্গে একটি তথ্যচিত্র জাতীয় গণমাধ্যমে বা স্থানীয়ভাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হবে। জলজ স্তন্যপায়ী আর নিজেদের নিরাপত্তার জন্য জেলেরা যাতে নিরাপদ জলপথ ব্যবহার করতে পারে সেই লক্ষ্যে কম খরচে ও সহজবোধ্য গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও আছে। আছে আশপাশের এলাকার গ্রামবাসী ও জেলেদের জলজ স্তন্যপায়ীর বিচরণক্ষেত্র, জীবনাচরণ পর্যালোচনা, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ুর পরিবর্তন, বাঁধের কারণে সুন্দরবন ও মোহনায় নদীর পানির স্বল্পতার মধ্যেও জলজ স্তন্যপায়ীর জীবনধারণ লক্ষ করে এদের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা।
জলজ স্তন্যপায়ীদের জন্য একটি সংরক্ষিত এলাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে বিসিডিপি। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আর উত্তরে মংলা বন্দর, পূর্বে বলেশ্বর আর পশ্চিমে পশুর নদকে সীমা ধরে মাঝখানে পূর্ব সুন্দরবনের নির্ধারিত অংশকে এই সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে সংরক্ষিত এলাকায় চিংড়ি মাছের পোনা ধরায় সুক্ষ্মজালের ব্যবহার বন্ধ ও পানিদুষণ রোধ করা গেলেই জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অবাধে বিচরণ করতে পারবে।
জলজ স্তন্যপায়ীর অবাধ বিচরণ ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধির লক্ষ্যেই বিসিডিপি ৯ থেকে ১২ অক্টোবর শিশু একাডেমীতে আয়োজন করে বাংলাদেশে প্রথম শুশুক মেলা। চার দিনব্যাপী এই মেলায় বিপুলসংখ্যক দর্শক উপস্থিতি প্রমাণ করে জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণিবৈচিত্র্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ আছে। বললেন বিসিডিপির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী এলিজাবেথ ফাহরনি মনসুর।
ডলফিনের অভয়াশ্রম
নিচের ছবিটি ভালো করে লক্ষ করুন। মনে হচ্ছে না পানির একটা অংশে ছায়া পড়েছে? আসলে কিন্তু ছায়াটায়া কিছু না। পানির রংই এ রকম। সুন্দরবনসংলগ্ন সমুদ্রের এই জায়গায় খাড়া নেমে গেছে গিরিখাদ। ৯০০ মিটার (প্রায় তিন হাজার ফুট) গভীর এই গিরিখাদ নাম রাখা হয়েছে সোয়াচ অব নো-গ্রাউন্ড। দুই দেশে বিস্তৃত চোঙাকৃতির এই জায়গার মুখের দিকে ৪০ কিলোমিটার আর মাথার দিকে ছয় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এই জায়গায় বিপুলসংখ্যক ডলফিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জায়গাটি মূলত ইন্দোপ্যাসিফিক বটলনোজ, স্পিনার ও প্যানট্রপিক্যাল স্পটেড ডলফিন, ব্রাইডস তিমি এবং সম্ভবত ফিন তিমির আবাস।
বাংলাদেশে যত ডলফিন
বাংলাদেশ হলো বিভিন্ন প্রজাতির বিপুলসংখ্যক জলজ স্তন্যপায়ীর অবাধ বিচরণক্ষেত্র। এশিয়ার অন্যান্য দেশ, যারা বাংলাদেশের প্রতিবেশী, তাদের তুলনায় বাংলাদেশের নদী ও উপকুলীয় এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির জলজ স্তন্যপায়ী অনেক বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, উপকুলীয় ও গভীর সমুদ্রের জলভাগ অসাধারণ সব প্রজাতির জলজ স্তন্যপায়ীর জন্য খুবই উপযোগী বাসস্থান।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পরিচিত ডলফিন হলো শুশুক। এরা সত্যিকারের নদীর ডলফিন। বিশেষ আকৃতির লম্বা ঠোঁট, পিঠের ছোট ডানা আর দুই পাশের বড় পাখনার কারণে শুশুক দেখতে একটু অদ্ভুত। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদীর সব জায়গাতেই শুশুকের বাস। সত্যিকারের নদীর ডলফিন সাগরের ডলফিনের দুরসম্পর্কের আত্মীয়। এদের ঠোঁট লম্বা এবং চোখ খুব ছোট। শুশুকের দৃষ্টিশক্তি খুবই দুর্বল। নদীর যে ঘোলা পানিতে এদের বসবাস, সেখানে দৃষ্টিশক্তির খুব একটা প্রয়োজন হয় না। এর বদলে এদের ইকোলোকেশনের শক্তি অনেক প্রখর। চলাচলের সময় জলজ স্তন্যপায়ীরা প্রতিধ্বনিত শব্দ দিয়ে মস্তিষ্কেক প্রতিচ্ছবি তৈরি করে।
শুশুকের শরীরের দুই পাশের বড় পাখনা ও নমনীয় ঘাড়ের জন্য এরা সহজে চলাচল করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, এরা কাত হয়ে সাঁতার কাটে। বড় পাখনার সাহায্যে এরা নদীর তলদেশ ছুঁয়ে পথ নির্ধারণ করে। এরা কিন্তু মোটেই সমাজবদ্ধ নয়। সাধারণত একাই থাকে। তবে অনেক সময় নদীর বাঁকে ও মোহনায় ছোট ছোট দলে দেখা যায়।
কিছু প্রজাতির ডলফিন নদী ও সাগর উভয় স্থানেই দেখা যায়। যেমন ইরাবতী ডলফিন। আমাদের দেশে এরা সুন্দরবনের মিঠা পানির নদী আর বঙ্গোপসাগরের উপকুলীয় অঞ্চলে বাস করে। নদীসহ যেসব উপকুলীয় জলাশয়ে নদী থেকে মিঠা পানি আসে, সেসব স্থানে ইরাবতী ডলফিন দেখা যায়। সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের জলপথে এরা শুশুকের সঙ্গে মিলেমিশেই থাকে।
গোলাপি ডলফিন বা ফিনলেস পরপয়েসকে মাঝেমধ্যে সুন্দরবনের নদীতে দেখা গেলেও এরা আসলে উপকুলীয় জলভাগে বাস করে, যেখানে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নদী থেকে মিঠা পানি আসে।
প্রথম আলো, শুক্রবারের ক্রোড়পত্র, অন্য আলো, ১৭, অক্টোবর, ২০০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত। এখানে ক্লিক করে বাকীটুকু পড়ুন
মৌমাছি কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে?
মুশফিকুর রহমান
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সংবাদমাধ্যমে এখন অন্যতম আলোচিত বিষয় মৌমাছির বিলুপ্তি-আশঙ্কা!
আমরা যখন পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করি, তখন একপশলা বৃষ্টিতে শহর ও লোকালয়গুলোর বসবাস অযোগ্য হয়ে ওঠা; বৃষ্টি বিলম্বিত হলে পরিষ্ককার পানির জন্য হাহাকার, বর্ষায় নর্দমা উপচে পথে এবং কখনো ঘরবাড়িতে উঠে আসা থেকে শুরু করে পাহাড়ধসে প্রাণহানি, নদীর দুই কুল উপচে ও পাড় ভেঙে মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করা, সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাস, সম্প্রতি অতি আলোচিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও তার আশঙ্কায় বাংলাদেশের কতভাগ স্কীত সমুদ্রের জলে ডুবে যাবে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যায়।
দুরবর্তী মনে হলেও বিশ্বজুড়ে জ্বালানির অব্যাহত ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং মানহীন জ্বালানি ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারে শহরাঞ্চলে বায়ুদুষণ, জীবনযাত্রা বিপন্ন হওয়ার বিষয়গুলো আমাদের অন্যতম আশঙ্কার উপাদান।
পরিবেশের অন্য বিষয়গুলোও আলোচনায় আসে, যেমন বন উজাড়, পানিদুষণ, প্রজাতি ও জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি বা বিপন্নতার বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির অব্যাহত চাপে মানুষের দিশেহারা হওয়ার অবস্থা। বিষয়টি অবাক করার মতো শোনালেও সত্যি যে জ্বালানি ও খাদ্যসংকটের সম্পর্ক নিবিড়। আবার দুষণ হ্রাস, বিশ্বের উষ্ণায়ন থেকে খানিক প্রশাসনের তাগিদে যে পরিবেশবান্ধব বায়োফুয়েল উৎপাদনের বর্ধিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে খাদ্যসংকট ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ঘটছে। আবার জ্বালানি ও জমি দুর্লভ হয়ে ওঠায় খাদ্যশস্যও দুর্লভ ও দুর্মুল্য হচ্ছে। এ দিক দিয়ে দেখলে পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ খাদ্য ও জ্বালানি উভয়কে ব্যয়বহুল করে তুলছে। আবার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশগত অভিঘাত এত প্রবল আশঙ্কার বিষয় হয়ে উঠেছে যে জীবাশ্ম জ্বালানির উত্তম বিকল্প অনুসন্ধান অবধারিত।
আমাদের হয়েছে ত্রিশঙ্কু অবস্থা। বেশি মানুষ আর স্বল্প সম্পদের মধ্যে দুর্বল ব্যবস্থাপনায় প্রতিমুহুর্তেই আমাদের টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই পরিবেশের যে বিপর্যয় দেখা দিক আমাদের তাতে নিষ্ককৃতি নেই। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে মৌমাছিগুলো কেন দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে, তাও আমাদের ভাবনার বিষয় না হওয়ার সুযোগ নেই। কেন?
মৌমাছি আমাদের পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও তার বিকাশের অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তি। অন্তত এক লাখ ৩০ হাজার উদ্ভিদের পরাগায়ণ সরাসরি মৌমাছির ওপর নির্ভরশীল। একটি মৌচাকে যে মৌমাছি বাস করে, তার চারপাশে ৪০০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে যত ফুল ফোটে, এক দিনে সেগুলোতে ঘুরে ঘুরে মধু সংগ্রহ ও পরাগায়ণ করতে সাহায্য করে ওইসব মৌমাছি। আমাদের চারপাশে যত ফুল ফোটে, ফল ধরে, শস্য, সবজি চাষ হয়, মৌমাছি সেসব ক্ষেত ও বাগানে না এলে কী হবে ভাবা যায়? যদি পরাগায়ণ বিঘ্নিত হয় তাহলে আমরাই কেবল ফল-মূল-শস্য থেকে বঞ্চিত হব তাই নয়, পুরো উদ্ভিদ ও প্রাণিকুলের খাদ্য ও জীবনচক্র হয়ে উঠবে বিপন্ন। মৌমাছি নিয়ে যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁরা তো আশঙ্কা করছেন−মৌমাছির বিলুপ্তিকে কয়েক বছরের মধ্যে অনুসরণ করবে মানুষ ও অন্যান্য প্রজাতি!
মৌমাছি যে মধু সংগ্রহ ও উৎপাদন করে তা কেবল পুষ্টি ও ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ নয়; মৌমাছির খাবার ও শক্তি জোগান দেওয়ার উপাদানও বটে। সুতরাং মৌমাছি বিলুপ্ত হলে বা আশঙ্কাজনকভাবে এর সংখ্যা কমে গেলে আমাদের আশঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এক বা একাধিক কারণে মৌমাছির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মৌচাষি ও গবেষকদের অনেকেই কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছেন মৌমাছির আশঙ্কাজনক হারে বিলুপ্তি। তাদের চোখে পড়েছে অত্যন্ত সংগত কারণেই অদ্ভুত ঘটনা−মৌচাক ছেড়ে উড়ে যাওয়া মৌমাছিগুলো অজানা কারণে ওই মৌচাকগুলোতে আর ফিরে আসছে না। সুযোগসন্ধানী অন্য মৌমাছির ঝাঁক সেগুলো সংগ্রহে উৎসাহ দেখাচ্ছে না। এতে মৌচাষিদের আশঙ্কা−হয়তো কোনো অজানা রোগ বা বিষক্রিয়া মৌমাছি ও তাদের সংগৃহীত মধু-মৌচাক আক্রান্ত করছে। এমন নয় যে মৌচাক ছেড়ে যাওয়া মৌমাছিগুলোর গণমৃত্য ও মৃতদেহ কোথাও ছড়িয়ে থাকা অবস্থায় কেউ খুঁজে পাচ্ছে। হয়তো মৌমাছির বিচরণ এলাকার বিস্তৃতি, ক্ষুদ্র ও দ্রুত ধ্বংস হওয়ার মতো দেহ এ ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা।
গবেষকেরা লক্ষ করেছেন যে ১৯৭১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় অর্ধেক মৌচাক বিলুপ্ত হয়েছে। সাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার মৌমাছিগুলো ইউরোপে তাদের সমস্যা ছড়িয়ে দিয়েছে এমন ধারণার কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু স্পেন, ফ্রান্স, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ড সুইজারল্যান্ড, ইতালি, গ্রিস, পর্তুগাল ও জার্মানিতে মৌমাছি ও মৌচাক বিলুপ্তির ব্যাপক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া মৌমাছির এই আকস্িনক মড়ক কেবল মৌচাষিদের নয়, পরিবেশ ও কৃষি, জীববৈচিত্র্যের সংকট হিসেবেই চিহ্নিত করা হচ্ছে।
জার্মান বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদেরা মৌমাছিগুলোর এই ব্যাপক মড়ককে মধু উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে এইডস মহামারির তুলনা করছেন। মৌচাক বিলুপ্তির এই ব্যাপক বিস্তৃতি-প্রবণতাকে নাম দেওয়া হয়েছে সিসিডি বা কলোনি কলাপস ডিসঅর্ডার। মৌমাছি ও মৌচাক বিলুপ্তির এই ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের কারণ অনুসন্ধানে নানামুখী গবেষণাও শুরু হয়েছে। এ জন্য শস্য ও কৃষি খাতে ব্যাপক মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারকে কেউ কেউ দোষারোপ করছে। ২০০৪ সালে মৌচাষিদের দাবির মুখে ফ্রান্সে ‘ফিপ্রোনিল’ নামের এক ধরনের কীটনাশক নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এই কীটনাশকের সঙ্গে মৌমাছি ধ্বংসের সম্পর্ক অস্বীকার করেছে।
বিভিন্ন অনুমানের মধ্যে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ফুডের (জিএম ফুড) বিস্তৃতিকেও অনেকে দায়ী করার চেষ্টা করছেন। আরও একধাপ এগিয়ে অনেক গবেষক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া মোবাইল-টেলিফোন প্রযুক্তিকে সম্পর্কিত করছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় মোবাইল ফোনের তেজস্ক্রিয় বিকিরণকে মৌমাছির ব্যাপক মড়কের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হচ্ছে। গবেষকদের একদল লক্ষ করেছে যে মোবাইল ফোনের টাওয়ারের আশপাশে মৌমাছি আসতে চায় না। ফিনল্যান্ডের সরকারি এক গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের ব্রেন টিউমার হওয়ার আশঙ্কা ৪০ শতাংশ বেশি বলে চিহ্নিত হয়েছে। মৌমাছি ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক মড়কের সঙ্গে এই গবেষণা ফলাফলকেও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। যদিও মোবাইল ফোন কোম্পানি এ সম্পর্কিত গবেষণা ও বিজ্ঞানীদের আশঙ্কাকে অমূলক বলতেই পছন্দ করেন।
বিখ্যাত লানডাও বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জোসেন কুন পরিচালিত গবেষণা অনুযায়ী মৌমাছি মোবাইল ফোন চালু রাখলে নিকটবর্তী মৌচাকে ফিরতে অপছন্দ করে বলে তথ্য দিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের গবেষণার বর্তমান পর্যায়ে বিশ্বজুড়ে দ্রুত মৌমাছি কেন বিলুপ্ত হচ্ছে তার স্পষ্ট উত্তর না পাওয়া গেলেও এ কথা নিশ্চিত যে মৌমাছি ও মৌচাক দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। তা ছাড়া মৌমাছির এই মড়ক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। একক কোনো কারণ, নাকি অনেক কারণের মিলিত ফল হিসেবে এই মৌমাছির মড়ক, তা এক্ষনি বলা কঠিন। তবে কৃষিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহূত কীটনাশক, প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের আধিক্য, মাইক্রোওয়েভ ও মোবাইল ফোন প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তৃতি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃষি এবং বনায়নে মনোকালচার (একই গাছ বা ফসলের চাষ) এ জন্য দায়ী বলে অনুমান করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান এখনো অনেক প্রশ্নেরই জবাব দিতে সমর্থ হয়নি। আবার প্রযুক্তির বিকাশ ও বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে অনেক নতুন সমস্যাও হাজির হচ্ছে। সে সমস্যাগুলো কেবল গবেষণাগার বা জ্ঞান জিজ্ঞাসার রহস্য নয়, এর সঙ্গে যুক্ত পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সরাসরি আমাদের খাদ্য ও জীবনের নিরাপত্তা।
মুশফিকুর রহমান: খনিবিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক।


